অধিকাংশ মৌসুমি ব্যবসায়ী লোকসানে বিক্রির পাশাপাশি কেউ কেউ সড়কে-মহল্লায় কাঁচা চামড়া ফেলে গেছেন। মূলত সিন্ডিকেটের কারণে বর্ধিত দামের পরিবর্তে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন চামড়া সংগ্রহকারীরা। গরুর চামড়ার দামে দরপতনে ছাগলের চামড়া বিক্রিই হয়নি। চামড়া সংগ্রহে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবস্থাপনায় চামড়া নিয়ে এবারো লোকসান ও পচনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
ঈদুল আজহার দিন রাজধানীর মোহাম্মদপুর, সায়েন্স ল্যাব ও পুরান ঢাকার পোস্তা এলাকায় বেশির ভাগ গরুর কাঁচা চামড়া ৬৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। ছোট চামড়ার দাম উঠেছে ৫৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা। রাজধানীর চামড়ার দাম অনেকটা বিগত বছরের মতোই ছিল।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ৮০ হাজার। সেখানে গরু-ছাগলসহ কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার পশু। চলতি বছর কোরবানির ঈদের মৌসুমে ৮০ থেকে ৮৫ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন ট্যানারি মালিকরা।
গত ২৬ মে কোরবানির পশুর চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৬০-৬৫ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫-৬০ টাকা। ঢাকার বাইরের গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫-৬০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫০-৫৫ টাকা। এছাড়া ঢাকায় সর্বনিম্ন কাঁচা চামড়ার দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আর ঢাকার বাইরে সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ১৫০ টাকা। এছাড়া খাসির লবণযুক্ত চামড়া ২২ থেকে ২৭ টাকা ও বকরির চামড়া ২০-২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
আড়তদাররা জানিয়েছেন, লবণযুক্ত চামড়ার যে দাম সরকার নির্ধারণ করেছে সেটি আড়ত থেকে ট্যানারি মালিকদের জন্য নির্ধারিত। সাধারণ মৌসুমি ক্রেতারা কাঁচা চামড়া কিনেই ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করে দেন। এক্ষেত্রে দরদাম করে তুলনামূলক কম দামে চামড়া কিনছেন তারা। প্রতিটি কাঁচা চামড়া লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াকরণে আরো ৪০০ টাকার মতো খরচ হয়। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা শুরুতে দাম ধরে রাখায় পরবর্তী সময়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
এদিকে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ কোরবানি হওয়া চট্টগ্রাম জেলায় চামড়া খাতে সবচেয়ে বড় ধস গেছে। চট্টগ্রামে প্রতিটি চামড়া বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। তবে কোরবানি ঈদের দিন সন্ধ্যার পর থেকে চামড়ার দাম আরো কমে যায়। কেউ কেউ লোকসানে বিক্রি করলেও এক পর্যায়ে সড়কে চামড়া ফেলে গেছেন মৌসুমি বিক্রেতারা। রোববার দুপুর পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহর থেকে সিটি করপোরেশন অন্তত ১০ টন পচা চামড়া সড়ক থেকে অপসারণ করেছে।
জানতে চাইলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ১৫০ টাকা। একটি ২০ ফুটের চামড়ায় ৪০০-৫০০ টাকা খরচ হয় প্রক্রিয়াজাত করতে। ট্যানারি মালিকরা চামড়া ক্রয়ের সময় প্রতিটি চামড়ায় ২০ শতাংশ বাদ দিয়ে হিসাব করেন। এ কারণে লবণ ছাড়া চামড়া বেশি দামে কেনার সুযোগ নেই। তবে শুরুতে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা পর্যন্ত চামড়া সংগ্রহ করা হলেও ঈদের দিন রাতে সর্বনিম্ন ২০০ টাকায় চামড়া বিক্রি হয়েছে।’
চট্টগ্রামের পাঠানটুলী এলাকার মো. জাহিদ নামের এক মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিটি ৪০০ টাকা করে ১৮টি চামড়া সংগ্রহ করেছিলাম। পরিবহন ও শ্রমিক মজুরিসহ দাম ৪৫০ টাকার মতো। কিন্তু প্রতিটি চামড়া ৪০০ টাকা করে বিক্রি করে দিয়েছি।’
নগরীর চৌমুহনী এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী মো. মনজু মিয়া বলেন, ‘১১০টি চামড়া প্রতিটি গড়ে ৪৮০ টাকা করে সংগ্রহ করেছি। কিন্তু ব্যাপারীরা বাড়তি দাম দিতে চায়নি। নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে শেষ পর্যন্ত ৩৫০ টাকা করে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছি। বড় আড়তদার ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কারণে বিগত দেড় দশক ধরে চামড়া ব্যবসায় লোকসান দিতে হচ্ছে। এ বছর সিন্ডিকেট থাকবে না আশা করে চামড়া সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু এবারো লোকসান দিতে হয়েছে।’
নগরীর দেওয়ানহাট ও চৌমুহনী, দুই নম্বর গেট এলাকায় শত শত মৌসুমি ব্যবসায়ী দাম না পেয়ে সড়কের পাশে চামড়া ফেলে চলে গেছেন। চৌমুহনীতে কয়েকজনের একটি মৌসুমি ব্যবসায়ী গ্রুপ দাম না পেয়ে প্রায় ২ হাজার চামড়া ফেলে গেছেন।
চামড়ার পচন ও দাম না পাওয়ার জন্য এ বছর শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেশব্যাপী বিনামূল্যে ৩০ হাজার টন লবণ বিতরণ কার্যক্রমকে দায়ী করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, সরকার ৩০ হাজার টন লবণ দেয়ার কথা বললেও বিতরণ করেছে মাত্র এক-চতুর্থাংশ। ফলে এ বছর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লবণ সংগ্রহ করেননি। যার কারণে কাঁচা চামড়া নিয়ে বিক্রির জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। এ সুযোগে আড়ত ও ব্যাপারীরা দাম কমিয়ে দিয়েছেন। এক পর্যায়ে পচন ধরতে শুরু করলে কম দামে বিক্রিতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের চাক্তাই এলাকার মেসার্স লাল মিয়া সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আসাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা কোরবানির অনেক আগেই পশুর চামড়া সংগ্রহ নিয়ে সংকটের কথা জানিয়েছিলাম। সরকার বিনামূল্যে দেশব্যাপী লবণ দেয়ার কথা জানানোয় কেউই লবণ সংগ্রহ করেনি। আবার সরকারও এক-চতুর্থাংশের বেশি লবণ দেয়নি। যার কারণে পাইকারি পর্যায়ে দেশব্যাপী চামড়ার জন্য নির্ধারিত মোটা লবণের সরবরাহ সংকট ও দাম বেড়ে যায়। মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা শতভাগ কাঁচা চামড়ার বিপণনে বাধ্য হন। যার সম্পূর্ণ সুযোগ নিয়েছেন আড়ত, ব্যাপারী ও ট্যানারি মালিকরা।’ পাশাপাশি দেশের শত শত লবণ মিল মালিক বড় লোকসানে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
চট্টগ্রামের আড়তদার সমিতির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মাহবুবুল আলম বণিক বার্তাকে জানান, ‘মৌসুমি বিক্রেতারা শুরুতে বাড়তি দাম দিয়ে চামড়া বিক্রি করেনি। অনেকে আবার দেরিতে চামড়া এনেছিলেন। এতে চামড়া পচে গেছে। চামড়া পচে যাওয়ায় কেউ কেনেননি। তবে তারা শুরুতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দিয়েও একেকটি চামড়া কিনেছেন। শেষ দিকে ২০০ টাকায়ও চামড়া নিয়েছেন।’ কেউ কেউ ক্রেতা না পেয়ে চামড়া ফেলে যাওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অনেক আড়তদার বলছেন, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ লবণযুক্ত চামড়ার দামের সঙ্গে কাঁচা চামড়ার দাম গুলিয়ে ফেলেন। এতে অনেক সময় তারা বেশি দামে চামড়া কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এবারো সেটা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা।